সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য বাছাই

Choosing Food for Good Health

Tag: Choosing Food for Good Health

প্রবাদে আছে, “মানসিক উৎকর্ষতা শারীরিক সুস্থতার উপর নির্ভর করে”। সুষম খাদ্য আমাদের দেহ ও মনকে কার্যক্ষম ও সক্রিয় রাখে। দেহ ও মনকে সুস্থতা সংরক্ষণের জন্য আমাদের কে পরিমিত ফল ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হয়, আমরা ভেতো বাঙ্গালী। ভাত খেয়ে ভূড়ি বাড়াতে আমাদের জুড়ি নেই। খাদ্যের পুষ্টিমান সম্পর্কে অবগত হতে আমরা উদাসীন। মুখের রুচি অনুসারে ফল, তরকারী, শাক সবজি বাদ দিয়ে কেবল গত্রুপাক মাংস, মাছ ও ডিম খেয়ে আমরা পাকস্থলীতে গড়ে তুলেছি নানা ব্যধির কারখানা। অথচ আমরা অনেকেই সঠিক ভাবে জানিনা, আমরা দৈনিক যে সকল খাদ্য খাই তাতে অফুরন্ত শক্তি ও রোগ নিরাময়ের উপাদান বিদ্যমান থাকে। সঠিক খাদ্য বাছাই করলে তা ক্ষুধা নিবারণ শেষে রোগ নিরাময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে দেহ- মনকে সুস্থ রাখে। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ  ও পুষ্টিমান সম্পন্ন কতিপয় ফল ও খাদ্যের ঔষধিগুণের অথ্য পেশ করা হলো-

আম- সোনালি এ ফলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন-এ, সি ও খনিজ লবণ। আম কোষ্ঠ- কাঠিন্য দূর করে। তবে কাঁচা ও টক আম বদ হজম ঘটাতে পারে।

কাঁঠাল- কাঁঠাল শক্তি শালী ও বলবান ফল। পিত্তের জন্য কাঁঠাল ভাল কাজ করে। তবে এটা হজম করা একটু কষ্টকর। এর জন্য হালকা ব্যায়াম অথবা হাঁটাচলা করতে হয়। কাঁঠালের বীজ যৌন শক্তি বাড়াতে ও কার্যকরি ভূমিকা পালন করে।

পেয়ারা- এটি অধিক ভিটামিন সি এর জন্য পরিচিত। এছাড়া ও রয়েছে সুগার ও পেকটিন। পেকটিন এর কারণে পেয়েরা কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে। মাথা ব্যথা ও হৃদ রোগ উপশমে ভাল ফল দেয় বলে মনে করা হয়। তবে অধিক পেয়েরা খেলে জ্বর, পেট ব্যথা, পেট ফাঁপা এমনকি অর্শ রোগের ও সৃষ্টি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে স্বল্প লবণ মিশিয়ে পেয়েরা খেলে ক্ষতি এড়ানো যেতে পারে।

লেবু- লেবুকে প্রাকৃতিক সুস্থতার সম্পদ বলা যেতে পারে। লেবু লিভারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি কত্রে। এক গ্লাস গরম পানির সাথে পরিমিত লেবু রস মিশিয়ে পান করলে তা চমৎকার দেহ টোনার হিসেবে কাজ করে। আর ত্বক এর সৌন্দর্য এবং সজীবতা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া লেবুর রস রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে, গ্যাস, বাত ও অস্থি সন্ধি প্রদাহ নিরাময় করে। খুশ খুশে কাশি, ডিপথেরিয়া ও ঠান্ডা নিরাময়ে লেবু ভাল ফল দেয়।

পেঁপে- এটি প্যাপিন ও প্যাপাইয়াটিন এনজাইম সমৃদ্ধ সুস্বাদু ফল যা প্রোটিন বিপাকে সাহায্য করে। তাছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ডি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং আয়ন। এজন্য ডাক্তারেরা কোষ্ঠ্য কাঠিন্য, অন্ত্রের গোলযোগ এবং কিডনি পাথর ইত্যাদিতে পেঁপে খাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে থাকেন। সর্বোপরি পেঁপে শরীরের ক্ষারীয় ভারসাম্য রক্ষা করে।

কলা- কলা হচ্ছে দ্রুত শক্তি উৎপাদনের উৎস। কলা প্নত্রের অস্থিরতা দূর করে ও স্টার্চ কে ফলের চিনিতে পরিণত করে। কলার রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফস্ফরাস, ম্যাগনেসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ লবণ। এ কারণে খেলোয়ার ও কায়িক পরিশ্রমিদের শরীর গঠনে কলা অদ্বিতীয় খাদ্য, রক্ত শূণ্যতা অথবা যারা আয়রনের অভাব জনিত চর্মরোগে ভোগে তাদের জন্য এটা উত্তম খাবার। সর্বোপরি কলা ভিটামিন এ ও বি কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ থাকায় শরীরের ওজন কমে যাওয়া, কোষ্ঠ্য কাঠিন্য এবং ডায়রিয়ায় উপকারি।

আনারস- আনারসে পেপসিন জাতীয় এনজাইম থাকায় প্রোটিন বিপাকে সাহায্য করে। এসিডোসিস ও বদ হজমে এটি ফলদায়ক। তাছাড়া রক্তের ক্ষার সংরক্ষরণের মাধ্যমে শরীর পানিতে ফুলে যাওয়া রোগে শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। তদুপরি, কাশি ও ব্রংকাইটিসে আনারস ভাল ফল দেয়।

জাম্বুরা- জাম্বুরায় অধিক পরিমাণে সাইট্রিক এসিড এবং কমলার চেয়ে কম পরিমাণে চিনি রয়েছে। অন্ত্রের প্রদাহ, অস্থি সন্ধির প্রদাহ ও বাত রোগে যেমন উপকারী তেমন কোষ্ঠ-কাঠিন্য ও রুচি ফিরিয়ে আনতে অব্যররথ মহৌষধ।

খেজুর- এতে অধিক মাত্রায় স্বাভাবিক চিনি বিদ্যমান। এটি সহজপাচ্য ও শোষণ যোগ্য খাদ্য। এতে আয়রন, ভিটামিন এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান রয়েছে। পাকস্থলী আলসারে ঠান্ডা দুধের সাথে খেজুর মিশিয়ে খেলেও উপকার পাওয়া যায়।

আপেল- আপেল কে সুখাদ্য, ঔষধ ও টনিক এবং পরিপাক তন্ত্রের নিয়ন্ত্রক ও কসমেটিক বললেও অত্যুক্তি হয় না। আপেলে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে। যা মস্তিষ্কে এবং স্নায়ুর খাদ্য হিসেবে চমৎকার। তদুপরি বেশি পরিমাণে পেকটিন থাকার কারণে এটি অন্ত্রের ক্ষত সারায়, পরিপাক নালীকে পরিষ্কার রাখে, পিত্ত্রসের প্রবাহ বাড়িয়ে দিবে স্থবির যকৃতকে সতেজ করে তোলে।

আঙ্গুর- চিনি, খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল। এটি দেহের সকল তন্ত্রকে পুনর্জীবিত করে। আঙ্গুরে টারটারিক এসিড বিদ্যমান। এটি লিভার এবং কিডনি কে উদ্দীপিত করে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।

কমলা- কমলায় প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ, ভিটামিন সি ও বি কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ। কমলা খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। কমলার রস দাঁতের জন্য ভাল, মাড়ির প্রদাহ, পায়োরিয়া প্রতিরোধ করে। কমলার কার্বোহাইড্রেট শরীরের শক্তি জমায় এবং খাদ্য হজম ও সমস্ত শরীরে স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনয়ন করে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাদ্য একটি নিত্য সঙ্গী। কোনটি খাবেন, কোনটি খাবেন না, তা নির্ধারণ করে আপনি ক্যান্সারের সম্ভাবনা কেও সহজে এড়াতে পারেন। বর্তমানে মৌসুমী ফল যেমন- পেয়েরা, জাম্বুরা, কূল, আপেল ও আমলকিতে যে ভিটামিন ‘সি’ আছে তা আমাদের দেহে যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে তেমন মুখের রুচি আনতে ও এদের ভূমিকা স্বীকৃত।

ফল ফলারি ও শাক সবজি, লাল ও ঢেঁকি ছাঁটা চাল এবং আটায় যে আঁশ আছে, তা অন্ত্রের মলাশয় বা কোলন ক্যানসারে প্রতিরোধী এখন এটি প্রমাণিত সত্য। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি কতিপয় খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের রোগ নিরাময়ী ও প্রতিরোধী ক্ষমতা নিয়ে যে গবেষণা করেছেন তা নিম্নে আলোক পাত করা হল-

নিউইয়র্ক স্ট্রেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জেনেছেন, গাজরে অবস্থিত পর্যাপ্ত ‘বিটা ক্যারোটিন’ ফুসফুসের ক্যান্সার রোধে ভাল ভূমিকা রাখে। তাছাড়া হলুদ শাক সবজি তেও প্রচুর বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়। আমাদের শরীরে বিটা ক্যারোটিন ভিটামিন ‘এ‘ তে রুপান্তরিত হয়। একটি গাজরে ৬৭৫০ আন্তর্জাতিক একক ‘বিটা ক্যারোটিন’ পাওয়া যায়। শরীরের এপিথেলিয়াল টিস্যু সংরক্ষণে বিটা কেরোটিন জাত  ভিটামিন ‘এ’ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এরা দেহের অন্যান্য বৃহৎ অঙ্গের ন্যায় ফুসফুস কে আবৃত করে রাখে।

হার্ভাভ মেডিক্যাল স্কুল ও আলবানি মেডিক্যাল কলেজ (নিউইয়ার্ক) এর বিজ্ঞানী রসায়ন বিদ ডঃ এরিক রক দেখেছেন ‘রসুন’ রক্তের জমাট বাঁধন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। রসুনে ‘এজোইন’ নামক এক ধরণের সক্রিয় পদার্থ থাকে যা অনুচক্রিকার পৃষ্ঠদেশে অবস্থিত কোষ সমূহে পরিবর্তন ঘটায়। যার ফলে অনুচক্রিকার আঠালো ধর্ম হ্রাস পায় বিধায় এরা পুঞ্জীভূত হতে পারেনা। তিনি বলেন কাঁচা রসুনের কোয়া চিবিয়ে নিয়মিত খেলে হৃদপিন্ড সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। সম্প্রতি গবেষণায় আমাদের দেশীয় ডাক্তার গণ উদ্ঘাটন করেছেন যে, কাঁচা রসুনের রস পান করলে রক্তের কোলেস্টেরল ও শর্করা এর মান হ্রাস পায়।

কতিপয় ডাচ গবেষক লক্ষ্য করেছেন যে, কম চর্বি সম্পন্ন দুগ্ধ জাত খাদ্য রক্তের এক চাপ কমাতে পারে। তাছাড়া খাদ্যে বেশি ক্যালসিয়াম থাকলে রক্তচাপ স্থির থাকে। ‘জন হপকিনস’ ভার্সিটির স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জন ডি রেপকির মতে গর্ভবতী মায়েরা প্রতিদিন ১৫০০ মিঃ গ্রাম ক্যালসিয়াম খেলে তাদের রক্তচাপ ৫%-৬% কমানো সম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়া ভার্সিটির একদল গবেষক দীর্ঘ ১২ বছর পর্যবেক্ষ্ণ করে দেখেছেন করে দেখেছেন যে যাদের খাদ্যে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে তাদের শতকরা ৪০ ভাগ স্ট্রোকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। কলা ও আলু পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য। দৈনিক আহারে বাড়তি খেলে ইপসিত ফলাফল লাভ করা সম্ভব।