মাথাব্যথা? জেনে নিন কেন হয় , লক্ষণ এবং এর প্রতিকার

Headaches symptoms and its remedy

মাথাব্যাথাঃ মাথাব্যাথা সাধারণত মানুষের একটি সাধারণ শারীরিক সমস্যা।স্বাভাবিকভাবেই শরীরে বিভিন্ন ইনফেকশন থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের বহু রোগের কারণে মানুষের মাথাব্যাথার সমস্যায় ভুগতে পারে। তবে অনেকসময় মাথা ব্যাথা দুশ্চিন্তার কারনেও হতে পারে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং ভাবের ওঠানামার ফলে যে মাথাব্যথা দেখা দেয় তাকে টেনশন মাথাব্যথা বলে। এ ধরনের মাথাব্যথা মাথার যে কোন পাশেই হয়ে থাকে। এটি আবার কখনও কখনও মাথার পেছনের অংশে এবং ঘাড়ের পেছনের দিকে পর্যন্তও ছড়াতে পারে। এবার আসুন মাথাব্যাথা কি তাই জেনে নেওয়া যাকঃ জীবনে কোন না কোন সময় মাথা ব্যাথায় পড়েননি এমন লোক খুবই কম পাওয়া যাবে বা নেই বললেই খুব একটা ভুল হবে না। কারণ মাথা থাকলে যে মাথা ব্যাথাও থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। দিনের প্রথম ভাগে বা শুরুতে, কাজের সময় এমনকি রাতের ঘুমের সময় মাথা ধরে পুরো দিনটাই মাটি করে দিতে পারে। তাই আমরা মাথাব্যাথা থেকে কীভাবে দূরে থাকা যায় এবং সুস্থ থাকা যাই সে বিষয়ে কিছু পদ্ধতি আপনাদের জানাবো । চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মাথাব্যথা বলতে আমরা বুঝি আমাদের মাথা, গলা এবং মেনিঞ্জেস-এর বিভিন্ন স্নায়ু এবং পেশীতে অনুভূত ব্যথাকে সাধারণত বোঝায়।

মাথাব্যথার প্রকারভেদঃ মাথাব্যথাকে আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ দুই ভাগে ভাগ করেছেন প্রাইমারী এবং সেকেন্ডারী। নিন্মে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ মাথাব্যথা যে শ্রেণীরই হোক না কেন তা যদি মাঝে মাঝেই হয়ে থাকে তবে আমাদের অবশ্যই উচিত হবে কোন না কোন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। কারণ তা না হলে অনেক সময় দেখা যায় খুব ছোট কোন রোগও আসলে বড় কোন রোগকে ডেকে নিয়ে আসে আমাদের জীবনে। অনিয়মিত খাদ্যভ্যাস, সাইনুসাইটিস, মাইগ্রেন এমন অনেক কারণেই আমাদের মাথাব্যাথা হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার মাথাব্যাথা থেকে রেহাই পেতে পেইনকিলারের দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। কিন্তু অতিরিক্ত পেইনকিলার খাওয়া মোটেই স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। কিছু কিছু খাবার আছে যেগুলা মাথাব্যাথা তৈরি করতে পারে, তেমনি কিছু খাবার মাথাব্যাথা কমাতেও সাহায্য করে।

Primary Headache: এই শ্রেণীর মাথাব্যথার মূলত তিনটি কারণ রয়েছেঃ

১. মাইগ্রেনঃ ‘মাইগ্রেন’ নামক শব্দটির সাথে পরিচয় নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না বা পাওয়া খুব মুশকিল। যার হয় সেই কেবল বুজতে পারে এই ব্যথার তীব্রতা কতখানি বেশি। আমাদের সেরেব্রাল কর্টেক্সের বিভিন্ন অংশে রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়াই মূলত মাথাব্যাথা জন্য দায়ী। মাইগ্রেনের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে আলো এবং গোলমালের প্রতি অনেক সংবেদনশীলতা, বিভিন্ন বিষ প্রতি বিতৃষ্ণাবোধ, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া এবং মাথার যেকোনো এক পাশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া।

২. দুশ্চিন্তাঃ আমাদের মাথা এবং গলার বিভিন্ন পেশীতে অতিরিক্ত স্ট্রেসের ফলে অথবা আবেগিক নানা কারণে দুশ্চিন্তাজনিত কারনেই মাথাব্যথা হয়ে থাকে। এই ধরণের মাথাব্যথাগুলোর সময় মাথায় এক ধরণের ঝিম ধরা অনুভূতি হয় এবং সেই সাথে আমাদের মাথার দু’পাশেই তীব্র ব্যথা হতে থাকে যা প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ মনে করে থাকেন যে এর সাথে হয়তো মাইগ্রেনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত।

৩. ক্লাস্টারঃ এ ধরণের মাথাব্যথাগুলো সাধারণত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটানা এমনকি কয়েক মাস ধরে নিজেদের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলতে থাকে। এদের উৎপত্তিও মাথার যেকোন এক পাশ দিয়েই হয়ে থাকে। এই টাইপের মাথাব্যথার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা না গেলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ মনে করে থাকেন রক্ত প্রবাহের পরিবর্তনের ফলেই এর উৎপত্তি। কারণ অ্যালকোহলের মতো যেসব পানীয় উপাদান আমাদের রক্ত প্রবাহকে প্রভাবিত করে তারা এই ধরণের মাথাব্যথার ক্ষেত্রে আরো উত্তেজক ভূমিকা পালন করে থাকে।

Secondary Headche: এই শ্রেণীর মাথাব্যথাগুলো মূলত ইনফেকশন, হাইপোগ্লাইকেমিয়া, জ্বর, মাথায় আঘাত, টিউমার ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে। এইগুলা টেনশনাল হেডেক বা দুশ্চিন্তা জনিত মাথাব্যথা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ মনে করে থাকেন যে এর সাথে হয়তো মাইগ্রেনের খুব ঘনিষ্ঠ রকম সম্পর্ক রয়েছে। Secondary Headche এর কিছু লক্ষণ নিন্মে দাওয়া হলঃ

১. লক্ষণ ও উপসর্গ
২. প্রথমে মাথা ব্যাথা এবং পরে মাথার পিছনে ব্যাথা আরম্ভ হয়ে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে ছড়িয়ে পরে।
৩. নিস্তেজ চাপ বা ঠেসে ধরার মত প্রচণ্ড ব্যথা, প্রায়ই মাথার চারপাশে একটা সংকুচিত ব্যান্ড হিসাবে বর্ণনা।
৪. শরীরের ঘাড়, কাঁধ, এবং চোয়াল এর মধ্যে পেশী টাইট অনুভব সহ পীড়া বা যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা বোধ করবে।
৫. এই ধরণের মাথাব্যথাগুলোর সময় মাথায় এক ধরণের ঝিম ধরা অনুভূতি হয় এবং সেই সাথে মাথার দু’পাশেই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভুত হতে পারে।
৬. আমাদের ঘুম এবং আহারে ভিন্ন ধরনের অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
৭. মাথা ব্যথা সাধারণত সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী স্থায়ী হতে পারে এবং ব্যথার তীব্রতা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তবে এতে জ্বর আসবেনা কখনই।
৮. মানসিক চাপে মাথার ব্যথা বাড়তে পারে। পুরুষ, মহিলা সমানভাবে এতে আক্রান্ত হয় বর্তমানে কিছুটা মহিলাদের মধ্যে মাথাব্যাথার চাপটা বেশি দেখা যায় তাও অঞ্চল ও সমাজের উপর নির্ভর করে।

মাথাব্যাথা বা মাইগ্রেনের কারণ: মাথাব্যাথা বা মাইগ্রেনের কারণ অনেক কিছু আছে। তার মধ্যে কিছু কারন আপনাদের জন্য তুলে ধরা হলঃ

১। হঠাৎ করে খাদ্যাবাস পরিবর্তন করলে মাথাব্যাথা হবার সম্বভনা বেশি থাকে। তাই ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করা আমাদের উচিত।

২। সাধারণত কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার এবং অতিরিক্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণে মাথাব্যাথা করতে পারে। কেননা তখন ব্রেইন জ্বালানি হিসেবে কার্বোহাইড্রেট ব্যবহার করে থাকে। তাই মস্তিষ্কে যথেষ্ট পরিমাণ কার্বোহাইড্রেটের অভাবে সেই মুহূর্তে মাথাব্যাথা করবে।

৩। আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে গেলে মাথাব্যাথা হবে। তাই সবসময় চেষ্টা করতে হবে রক্তে সুগারের পরিমাণ সঠিক মাত্রায় রাখা।

৪। এছাড়া অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ বা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে খাওয়া মাথাব্যাথার জন্য দায়ী। র্নিদিষ্ট বিরতিতে খাবার খাওয়া উচিত।

৫। মাথাব্যাথার আরেকটি কারণ হল পানি। আমাদের শরীরে যথেষ্ট পানির সরবারহ না হলে বা না থাকলে মাথাব্যাথা করবে।

৬। পরিবারের যদি কারো মাইগ্রেনের সম্যসা থাকে তাহলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ৩০ শতাংশ এ সম্যমায় ভুগার সম্ভবনা থাকে।

৭। যেকোন ধরণের এলকোহল বা পানীয় মাইগ্রেনের সম্যসায় জন্য অনেকটা দায়ী। তাই যাদের মাইগ্রেনের সম্যসা আছে তারা সব ধরণের পানীয় এড়িয়ে চলা ভাল।

৮। চকলেট বা মিষ্টি জাতীয় যেকোনো খাবার সাধারণত মাথাব্যাথার জন্য দায়ী। প্রায়ই মহিলাদের অতিরিক্ত চাপে বা হরমোনের পরিবর্তনের সময় মিষ্টি জাতীয় খাবারে আগ্রহী দেখা যায়। কিন্তু মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য এসব চর্বিযুক্ত খাবার মটেও ঠিক নয়।

৯। আমরা সবাই কফি খেতে খুব পছন্দ করি। কফি আমাদের মধ্যে অনেকটা আসক্তিও তৈরি করে থাকে। তাই যারা নিয়মিত কফি খেতে অভ্যস্ত তারা হঠাৎ কফি ছেড়ে দিলে মাথাব্যাথা করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। হঠাৎ কফি ছেড়ে দিলে মাথাব্যথা, বিরক্তসহ আরও অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

১০। প্রাকৃতিক যে চিনি গুলো আছে এই চিনি খুব উপকারী। কারণ উদ্ভিদ ও প্রাণীর শক্তি রাসায়নিকভাবে জমা করে এই চিনি তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যে কৃত্রিম চিনি ও মিষ্টি খাবার খাই এই খাবারগুলো মাথাব্যাথার জন্য দায়ী।

বিশেষজ্ঞ দের পরামর্শ অনুযায়ী

১) টেনশন, দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা এসব মনের ওপরে অনেকটা চাপ ফেলে, যা আমাদের জন্য অনেক ক্ষতিকর। সারাক্ষণ মানসিক অস্থিরতার মাঝে থাকলে মাথা ব্যথা তো হবেই, এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। দুশ্চিন্তা কমাতে হবে, পেশাগত মানসিক চাপ ঘরে বয়ে আনা যাবে না কখনই। মনকে একটু বিশ্রাম দিন, ঘরে ফিরে মাথা থেকে কাজের কথা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একান্ত বা প্রিয়জনের সাথে কিছু সময় কাটান।

২) বিশ্রাম নিন পর্যাপ্ত পরিমাণে। গবেষকেরা দেখেছেন ঠিকমতো ঘুম না হলে মাথায় ব্যথা হওয়ার সম্বভনা থাকতে পারে। কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা ঘুম দরকার পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য। কম ঘুমানো, ঘুমের মাঝে বাধা, সাউন্ড স্লিপ না হওয়া থেকে বাঁচতে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। অন্ধকার শব্দহীন ঘরে একটা আরামের ঘুম দিন, দেখবেন পরের দিন আর মাথা ধরা থাকবে না।

৩) লালসবজি পালংশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে রিবোফ্লাভিন, এক ধরণের ভিটামিন বি যা মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যাথায় কাজে দেয়।

৪) তৈলাক্ত মাছ এবং সামুদ্রিক মাছে থাকা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড আমাদের শরীরের জন্য ভীষণ উপকারি। এ সকল মাছের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যাথা কমে আসে।

৫) মাথাব্যাথার জন্য পটাসিয়াম বেশ উপকারি। পাকা কলায় প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে আমরা জানি, কিন্তু আলুও এর কম যায় না। মাঝারী আকৃতির একটি সেদ্ধ আলুতে থাকে ৯২৬ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম, যা একটি কলায় থাকা পটাসিয়ামের প্রায় দ্বিগুণ।

৬) কফি বা চায়ের ক্যাফেইনে আসক্তি হয়ে যাবার ভয় থাকলেও, পরিমিত পরিমাণে ক্যাফেইন মাথাব্যাথা কমাতে কার্যকরী। অনেক মাথাব্যাথার ওষুধেই অল্প পরিমাণে ক্যাফেইন থাকে। তবে ক্যাফেইনের ওপর বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সমস্যা, তখন ক্যাফেইন গ্রহণ ছেড়ে দিলে দেখা দিতে পারে মাথাব্যাথা।

৭) গবেষকদের কিছু কিছু গবেষণায় বলা হয় ম্যাগনেসিয়াম মাথাব্যাথার জন্য ভালো, যদিও এ ব্যাপারে শক্ত প্রমান নেই। কাঠবাদাম ম্যাগনেসিয়ামের একটি ভালো উৎস হতে পারে।

৮) সিগারেটের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে মাইগ্রেনের ব্যাথার পেছনে। যারা নিয়মিত ধুমপানে আসক্ত এবং তাদের আশে পাশে যারা থাকেন তাদের মাথাব্যাথা বেশি হয় এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। তাই ধূমপান ও ধূমপায়ী থেকে সবসময় দূরে থাকার চেষ্টা করুন।

চিকিৎসাঃ মাথাব্যাথা সমস্যায় রোগীর একমাত্র সঠিক সমাধান হল, দুশ্চিন্তা কমিয়ে আনা। মাথাব্যাথার রোগীকে দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য চেষ্টা করানো এবং ধ্যান করার মানসিকতার চেষ্টা চালাতে হবে। তবে দুশ্চিন্তা কমানোর যেমন- সেডিল, লেক্সাটানিল এবং অবসাদগ্রস্ততা নিবারণের ওষুধ (এমিট্রিপটাইলিন, সাট্রলিন, ফ্লুওক্সিটিন ইত্যাদি) দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে মাথাব্যথা অনেকটা কমে আসে।